পড়ুন

Showing posts with label জীবনী. Show all posts

Tuesday, December 15, 2015

আব্রাহাম লিংকনের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার গল্প


ব্যক্তিগত পরিচিতি:
আব্রাহাম লিংকন, আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট, ১৮০৯ সালের ১২-ই ফেব্রুয়ারি, আমেরিকার কেনটাকি রাজ্যের হার্ডিন কাউন্টিতে অতি সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম থমাস লিংকন ও মায়ের নাম ন্যান্সী হ্যাঙ্কস লিংকন। লিংকনের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর তখন তার মা মারা যান এবং এর কয়েক মাস পরে তার বাবা আবারও তিন সন্তানসহ একজন বিধবা মহিলা সারাহ বুশ জন্সটনকে বিয়ে করেন। তিনি আব্রাহামকে খুব ভালবাসতেন এবং তাকে লেখাপড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। আব্রাহাম লিংকনের ছিল বই পড়ার প্রতি অসম্ভব রকমের আগ্রহ। কিন্তু লিংকন সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৮ মাস প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেছেন। লিংকন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি। বই পড়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পথ হেটে বই সংগ্রহ করেছেন। তিনি পারিবারিক বাইবেল এবং তখনকার বিখ্যাত বইসমূহ যেমন- রবিনসন ক্রুসো, তীর্থযাত্রীদের অগ্রগতি ও ইশপের গল্প পড়তে খুবই পছন্দ করতেন। জ্ঞান অন্বেষণে লিংকন ছিলেন একজন মনযোগী পাঠক।
পেশা:
খুব ছোট বেলা থেকেই লিংকন তার দরিদ্র বাবার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কাঠ কাটার কাজ করেন। এরও আগে তিনি নৌকা চালিয়ে রোজগার করতেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি তার বন্ধুর সাথে যৌথভাবে একটি দোকান কিনে ব্যবসায় শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় মন্দা থাকায় তিনি তার শেয়ার বিক্রি করে দেন। পরে তার বন্ধুর মৃত্যু হয় এবং তার বন্ধুর করা $১০০০ ঋণ তিনি ১৭ বছর ধরে পরিশোধ করেন। লিংকন তার জীবনে পোস্টমাস্টার, দোকানদার, এমনকি একজন সাধারণ মুদি দোকান মালিক হিসেবে কাজ করেছেন।
ব্লাক হ্যাক যুদ্ধের পর আব্রাহাম লিঙ্কন তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ১৮৩৪ সালে ইলিনয়ে Whig Party-র রাজ্য আইনসভার একজন সদস্য নির্বাচিত হন। এই সময়ে তিনি একজন আইনজীবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং William Blackstone এরCommentaries on the Laws of England’ বই নিজে নিজে পড়া শুরু করেন। ১৮৩৭ সালে বারে ভর্তি হওয়ার পরে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে চলে যান এবং সেখানে জন টি স্টুয়ার্ট ল ফার্মে অনুশীলন শুরু করেন। ১৮৪৪ সালে আব্রাহাম লিঙ্কন William Herndon এর সাথে যৌথভাবে অনুশীলন শুরু করেন।
রাজনৈতিক জীবন:
আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার ১৬ তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং তার রাষ্ট্র পতিত্বের মেয়াদকাল ১৮৬১-১৮৬৫ পর্যন্ত। ১৮৬০ সালে তিনি রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৮৪৭-১৮৪৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে লিংকন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে স্টিফেন ডগলাসের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। এই সময় ‘লিংকন-ডগলাস বিতর্ক’ এবং ক্রীতদাস প্রথা সংক্রান্ত কানসাস-নেব্রাস্কা আইনের উপর বিতর্ক, অল্প সময়ের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় পর্যায়ে সুখ্যাতি এনে দেয়।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাস প্রথার অবসান ঘটান। ১৮৬৩ সালে মুক্তি ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দাসদের মুক্ত করে দেন। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত মার্কিন গৃহযুদ্ধে তিনি ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন। এতে ৩৫ লাখ ক্রীতদাস মুক্ত হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৮৬৩-এর নভেম্বর মাসে পেনসালভেনিয়া অঙ্গ রাজ্যের গেটিসবার্গে লিংকন একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণই ইতিহাসে বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ হিসেবে পরিচিত। এটিই পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে এখনও উদ্ধৃত হয় বিশ্বব্যাপী।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ১৫ এপ্রিল ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। লিংকন ছিলেন মিষ্টভাষী এবং বিনয়ী। জনতাকে আকৃষ্ট করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি নিউ সালেমে ইলিনয়েস জেনারেল এসেম্বলি নির্বাচনে উইগ পার্টির পক্ষে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি পার্টির মনোনয়ন পান এবং আইন সভায় উইগ পার্টির হয়ে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক সফলতার ক্ষেত্রে তাকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞার অন্যতম প্রবক্তা। তার দেওয়া গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও নীতি আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও সর্বজন গৃহীত। গণতন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, “The government is the people, for the people, by the people, shall not perish from the earth.” অর্থাৎ “সরকার হলো জনগণ, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, যা  কখনোই ধ্বংস হবে না”।
আমেরিকার অখণ্ডতা বজায় রাখা,গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিংকন এখনও আমেরিকার আদর্শ হয়ে আছেন যা আমেরিকার মানুষের কাছে তথা বিশ্বব্যাপী মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। লিংকন ১৮৬৪ সালে পুনরায় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। লিংকন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল উইলকেস বুথ নামের এক আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে পরের দিন নিহত হন।
ব্যক্তিগত কিছু গুণাবলি ও ঘটনা:
  • আব্রাহাম লিংকন একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে আমেরিকার সেরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তার নিজেকে আমেরিকানদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি মহান হতে পেরেছেন।
  • একজন বক্তা, লেখক, বিতার্কিক, রসিক ও আলোচক হিসেবে তার কথাগুলো আজও আমাদের বিনোদন ও শিক্ষা দিয়ে থাকে।
  • ছোটবেলায় তিনি তার বন্ধুদের জড়ো করে উঁচু এক স্থানে উঠে বক্তব্য রাখতেন।
  • ইলিনয়ে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময়, লিংকন প্রায়ই সন্ধ্যায় একটি পানশালায় তার বন্ধুদের সাথে গল্প বলা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতেন।
  • ১৮৪০ সালে এক রাজনৈতিক সভায় তিনি তার প্রতিপক্ষ  লেস থামাসকে নকল করে তাকে মজা করেছিলেন যা দর্শক তুমুলভাবে করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়।
  • রাষ্ট্রপতি লিংকন আবেগপ্রবণ কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি প্রতিপক্ষের ঢালাওভাবে সমালোচনা করতেন না। তিনি শত্রু সহ অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং প্রতিকূল পরিবেশে তিনি তার এই শক্তিকেই কাজে লাগাতেন।
  • একবার এক রাজনৈতিক বিতর্কে স্টেফেন ডগলাস নামে এক ব্যক্তি তাকে দুই মুখো হিসেবে উল্লেখ করলে, এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, “সেটা দর্শকরাই বিচার করবে। আমার যদি অন্য আরেকটি মুখ থাকত তাহলে আমার বর্তমান এই মুখ ধরে রাখার কি কোন দরকার আছে?”
  • একবার তার ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা কারো শত্রু নই, আমরা সবাই বন্ধু। আন্তরিকতায় ব্যাঘাত ঘটলেও তা যেন সম্পর্কের বন্ধনকে ছিন্ন না করে।”
  • একবার তিনি জানতে পারলেন যে, সেক্রেটারি অফ ওয়ার এডউইন স্ট্যানটন তার আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছের এবং তাকে মূর্খ বলেছেন। লিংকন তাকে জিজ্ঞেস করেন সে তাকে মূর্খ বলেছে কিনা। জবাবে তাকে হ্যাঁ বলা হল, সে দুইবার তাকে মূর্খ বলেছে। এরপর লিংকন বলেন, “ঠিক আছে, স্ট্যানটন যা মনে করেছে তাই বলেছে, আমি এখন তার কাছে গিয়ে কথা বলে জানার চেষ্টা করব সে কেন এমনটা করেছে।”
  • রাষ্ট্রপতি হিসেবে লিংকনও মাঝে মাঝে রাগের বশবর্তী হতেন যা তিনি তার চিঠিগুলোর মধ্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন। কিন্তু তিনি তার এই রাগ মাখানো চিঠিগুলো কখনও পোস্ট করতেন না। অনেক পরে এই চিঠিগুলো আবিষ্কার করা হয় রাষ্ট্রপতির টেবিলের ড্রয়ারে অ-স্বাক্ষরিত অবস্থায়।
  • আব্রাহাম লিংকন কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও ছিলেন অসাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন এক মহান ব্যক্তি। তার প্রমাণ মেলে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রাখা বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন যা আজও শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাদানের পথ-নির্দেশিকা হিসেবে প্রচলিত।
তার লেখা সেই চিঠিটি নিচে বাংলা ও ইংরেজিসহ উল্লেখ করা হল--
বাংলায়:
মাননীয় মহাশয়,
আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।
আমার পুত্রকে অবশ্যই শেখাবেন-  সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়। তাকে এও শেখাবেন প্রত্যেক খারাপ লোকের মাঝেও একজন বীর থাকতে পারে, প্রত্যেক স্বার্থবান রাজনীতিকের মাঝেও একজন নিঃস্বার্থ নেতা থাকে। তাকে শেখাবেন পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান। এও তাকে শেখাবেন, কিভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয় এবং কিভাবে বিজয়োল্লাস উপভোগ করতে হয়। হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তাকে দিবেন। যদি পারেন নীরব হাসির গোপন সৌন্দর্য তাকে শেখাবেন। সে যেন আগেভাগেই এ কথা বুঝতে পারে- যারা পীড়নকারী তাদেরই সহজে কাবু করা যায়। বইয়ের মাঝে কি রহস্য আছে তাও তাকে বুঝতে শেখাবেন। আমার পুত্রকে শেখাবেন – বিদ্যালয়ে নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া অনেক বেশী সম্মানজনক। নিজের উপর তার যেন সুমহান আস্থা থাকে। এমনকি সবাই যদি সেটাকে ভুলও মনে করে। তাকে শেখাবেন, ভদ্রলোকের প্রতি ভদ্র আচরণ করতে, কঠোরদের প্রতি কঠোর হতে। আমার পুত্র যেন এ শক্তি পায়- হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার। সে যেন সবার কথা শোনে এবং তা সত্যের পর্দায় ছেঁকে যেন ভালোটাই শুধু গ্রহণ করে- এ শিক্ষাও তাকে দিবেন।
সে যেন শিখে দুঃখের মাঝে কীভাবে হাসতে হয়। আবার কান্নার মাঝে লজ্জা নেই একথা তাকে বুঝতে শেখাবেন। যারা নির্দয়, নির্মম তাদের সে যেন ঘৃণা করতে শেখে। আর অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ থেকে সাবধান থাকে।
আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য। তাকে এ শিক্ষাও দিবেন- নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস্থা থাকে আর তখনই তার সুমহান আস্থা থাকবে মানবজাতির প্রতি।           
ইংরেজিতে:
He will have to learn, I know, that all men are not just, all men are not true, but teach him also that for every scoundrel there is a hero; that for every selfish politician, there is a dedicated leader... Teach him that for every enemy there is a friend.
It will take time, I know, but teach him, if you can, that a dollar earned is of far more value than five found...Teach him to learn to lose...and also to enjoy winning. Steer him away from envy, if you can, teach him the secret of quiet laughter. Let him learn early that the bullies are the easiest to lick...Teach him, if you can, the wonder of a book...but also give him quiet time to ponder the eternal mystery of birds in the sky, bees in the sun, and flowers on a green hillside.
In school, teach him it is far more honorable to fail than to cheat...Teach him to have faith in his own ideas, even if everyone tells him they are wrong...Teach him to be gentle with gentle people, and tough with the tough. Try to give my son the strength not to follow the crowd when everyone is getting on the bandwagon...Teach him to listen to all men...but teach him also to filter all he hears on a screen of truth, and take only the good that comes through.
Teach him, if you can, how to laugh when he is sad...Teach him there is no shame in tears. Teach him to scoff at cynics and to beware of too much sweetness...Teach him to sell his brawn and brain to the highest bidders, but never to put a price tag on his heart and soul. Teach him to close his ears to a howling mob...and to stand and fight if he thinks he is right.
Treat him gently, but do not coddle him, because only the test of fire makes fine steel. Let him have the courage to be impatient...let him have the patience to be brave. Teach him always to have sublime faith in himself, because then he will always have sublime faith in mankind.
This is a big order, but see what you can do...He is such a fine little fellow, my son!
আব্রাহামের কিছু বিখ্যাত উক্তি:
  • “প্রত্যেককে বিশ্বাস করা বিপদজনক, কিন্তু কাউকে বিশ্বাস না করা আরও বেশি বিপদজনক”।
  • “যার মা আছে সে কখনও গরীব নয়। আমি যা, বা যা হতে চাই না কেন আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী”।
  • “চরিত্র হচ্ছে গাছের মত, আর পরিচিতি হচ্ছে ছায়ার মত। ছায়া হচ্ছে আমরা যা ভাবি তাই, আর চরিত্র হল আসল গাছ”।
  • “যে মানুষ যতটা সুখী হতে চাই সে ততটাই পারে। সুখের কোন পরিসীমা নেই। ইচ্ছে করলেই সুখকে আমরা আকাশ সমান করে তুলতে পারি। অধিকাংশ জাতিই সুখী হতে পারে যদি তারা সেভাবে মানসিক প্রস্তুতি নেয়”।
  • “শাস্তির চেয়ে ক্ষমা মহৎ”।
  • “যারা অপেক্ষা করে তারাই পাই, আর তারাই হারায় যারা তাড়াহুড়া করে”।
  • “তুমি যা-ই হও না কেন ভাল কিছু হও”।
  • “যথাস্থানে পা রেখেছো কিনা তা আগে নিশ্চিত হও, এরপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও”।
  • “কোন মানুষেরই একজন সফল মিথ্যাবাদী হওয়ার মত যথেষ্ট স্মৃতিশক্তি নেই”।
  • “আমাকে একটি গাছ কাটতে ৬ ঘণ্টা সময় দাও এবং আমি ৪ ঘণ্টাই কুড়াল ধার দেব”।

সক্রেটিস বিশ্বের সবচেয়ে বড় দার্শনিক


সাধারণ পরিচিতি:
প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস ৪৬৯ খ্রিষ্টপূর্বে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সফ্রোনিসকস  (Sophroniscus)। তিনি ছিলেন একজন ভাস্কর। সক্রেটিসের মায়ের নাম ফেনারিটি (Phaenarete)। পেশায় তিনি ধাত্রী ছিলেন। এই মহান দার্শনিক সম্পর্কে তার নিজের লিখিতভাবে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। যে তথ্য পাওয়া যায় তা হল তার শিষ্য প্লেটো-র ডায়ালগ এরিস্টোফেনিসের নাটকসমূহ এবং সৈনিক জেনোফোন এর লেখা বর্ণনা থেকে। সক্রেটিস জন্ম নিয়েছিলেন এক অতি দরিদ্র কারিগরের ঘরে। তার বাবা এবং মা উভয়েই অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করতেন। তথাপি সংসারে সারাক্ষণ অনটন থাকার কারণে তাকে স্কুলে পাঠাতে পারেননি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের তেমন সুযোগ হয়নি তার। কিন্তু তিনি স্বীয় বুদ্ধি, বিবেক, মেধা-মননের সাহায্যে সৃষ্ট করেছিলেন গভীর এর জ্ঞানভাণ্ডার। সক্রেটিস দেখতে ছিলেন খুব সাদামাটা ধরনের। তার চেহারা ছিল কালো এবং কুৎসিত ধরনের। পোশাক পরিচ্ছদ ছিল একেবারে সাধারণ। পোশাকের ব্যাপারে তার দর্শন ছিল এরকম—
“পেষাক দিয়ে কি হবে? পেষাক তো বাহিরের আবরণ মাত্র। জ্ঞানই হল আসল সৌন্দর্য”।
চ্যাপ্টা নাক, মোটা ও বেঁটে, মলিন-বেশ এবং কিছুটা উদভ্রান্ত এবং আগ্রহী দৃষ্টির জন্য তাঁকে আসলে দার্শনিক বলে মানানসই মনে হতো না । যদিও শারীরিকভাবে কুৎসিত এবং কখনো নোংরা তাঁর ছিল প্রচণ্ড মানসিক শক্তি ও মেধা।
শিক্ষা-দীক্ষা:
আগেই উল্লেখ করেছি দারিদ্র্যতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা তার তেমন হয়নি। তিনি ছিলেন স্ব-শিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল অসাধারণ মেধা এবং চমৎকার কথা বলার ক্ষমতা। একবার সক্রেটিসের ভদ্র ও মধুর আচরণে, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে ক্রাইটো  নামের একজন ধনী ব্যক্তি তার পড়ালেখার সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করেন। সক্রেটিস ভর্তি হলেন এনাক্সগোরাস (Anaxagoras) নামের এক গুরুর কাছে। কিছুদিন পর কোনো কারণে এনাক্সগোরাস আদালতে অভিযুক্ত হলে সক্রেটিস আরখ এখলাসের শিষ্য হলেন।
কর্মজীবন:
সক্রেটিস স্থায়ীভাবে কোন পেশা গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না। তিনি ঠিক কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন তা পরিষ্কার নয়। ছোটবেলায় তিনি পাথর কাটার কাজ করতেন। এনাক্সগোরাস নামের গুরুর কাছে ভর্তি হবার পর তিনি আর সে কাজ করেননি। সক্রেটিস নিজে একজন ভাস্কর ছিলেন। একটা সময় তিনি পাথরের মূর্তি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে রোজগার করতেন। প্রাচীনকালে অনেকেই মনে করতো গ্রিসের অ্যাক্রোপলিসে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিরাজমান ঈশ্বরের করুণা চিহ্নিতকারী মূর্তিগুলো সক্রেটিসের হাতে তৈরি। অবশ্য এখনকার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এই বিষয়ে মতপার্থক্য আছে।
জেনোফোন রচিত সিম্পোজিয়াম থেকে জানা যায়, সক্রেটিসকে কখনও কোন পেশা অবলম্বন করবেন না। কারণ তিনি ঠিক তা-ই করবেন যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আর তা হচ্ছে দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা। এরিস্টোফেনিসের ক্লাউডস্‌ রচনায় পাওয়া গেছে যে সক্রেটিস শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নিতেন এবং গ্রিসের চেরিফোনে একটি সোফিস্ট বিদ্যালয়ও পরিচালনা করতেন। আবার প্লেটোর অ্যাপোলজি এবং জেনোফোনের সিম্পোজিয়ামে দেখা যায় সক্রেটিস কখনই শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেননি। বরং তিনি তার দরিদ্রতার দিকে নির্দেশ করেই প্রমাণ দিতেন যে, তিনি কোন পেশাদার শিক্ষক নন। তার ভাষায়— “নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ায় আমার অভ্যাস, আর এজন্যই এমনিতে না পেলে পয়সাকড়ি দিয়েও আমি দার্শনিক আলোচনার সাথী যেগাড় করতাম।”
তরুণ বয়সে সক্রেটিস সৈনিক ছিলেন। প্লেটোর বর্ণনায়, সক্রেটিস তিনটি অভিযানে এথেনীয় সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। অভিযানগুলো সংঘটিত হয়েছিল পটিডিয়া, অ্যাম্ফিপোলিস এবং ডেলিয়ামে। যুদ্ধে সক্রেটিস অসাধারণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধের  পর তার মন ক্রমশই যুদ্ধের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠল। তিনি চিরদিনের মতো সৈনিকবৃত্তি পরিত্যাগ করে ফিরে এলেন এথেন্সে।
এথেন্স তখন জ্ঞান-গরিমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শৌর্য, বীর্যে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। তখন এথেন্সে ছিল শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগ। ফলে তিনি নিজেকে জ্ঞানচর্চা থেকে বিরত রাখতে পারেননি। এভাবে জ্ঞানচর্চা করেই কেটে যায় তার সারাটা জীবন।
জীবনের ঘটনাপ্রবাহ:
মধ্য বয়সে তিনি বাজারে বাজারে ঘোরাঘুরি করতেন, প্রায়ই মানুষজনকে ধরে থামাতেন আর বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু বিব্রতকর সব প্রশ্ন করতেন। এই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতেন সেগুলো ছিল ক্ষুরধার এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ। খুব সহজ-সরল মনে হলেও আসলে প্রশ্নগুলোর উত্তর অতটা সহজ সরল বা সরাসরি দেয়ার মতো ছিল না মোটেই। উদাহরণ হিসেবে ইউথিডেমোসের সাথে কথোপকথনের কথা বলা যায়। সক্রেটিস তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, প্রতারণা করা কি অনৈতিক? “অবশ্যই”, সহজ-সরল উত্তর দিলেন ইউথিডেমোস। তিনি ভাবলেন সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সক্রেটিসের প্রশ্ন ছিল একটু অন্যরকম। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন ধর তোমার কোন বন্ধু আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে এবং তুমি তার অস্ত্রটা চুরি করলে। তাহলে? সেটা কি প্রতারণার মধ্যে পড়ে? অবশ্যই তা প্রতারণার মধ্যে পড়ে, পুনরায় উত্তর দিলেন ইউথিডেমোস। কিন্তু ঠিক এ কাজটা করাই কি উচিত আর নৈতিক নয়? এটা একটা ভাল কাজ, একজনের জীবন রক্ষা করছেন, বন্ধুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করছেন – যদিও কাজটি প্রতারণা। অসহায় ভাবে ইউথিডেমোস বললেন, হ্যাঁ, তা ঠিক। চতুর পাল্টা-যুক্তি প্রয়োগ করে সক্রেটিস ইউথিডেমোসকে দেখিয়ে দিলেন যে, প্রতারণা সব ক্ষেত্রেই অনৈতিক কাজ নয়। ইউথিডেমোস এ ব্যাপারটা আগে কখনও এভাবে ভেবে দেখেননি।
সক্রেটিসের সময় এথেন্সে বিত্তবানদের ছেলেদের দর্শনের শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হতো জ্ঞানার্জনের জন্য। দর্শনের শিক্ষকরা ছিলেন খুবই চতুর প্রকৃতির। তাঁরা ছাত্রদের বক্তৃতা দেয়া শেখাতেন। এ জন্য তাঁরা অনেক উঁচু সম্মানী আদায় করতেন। কিন্তু সক্রেটিস কোন প্রকার সম্মানী নিতেন না। তিনি দাবি করতেন, তিনি কিছুই জানেন না। আর কিছুই না জানলে তিনি শেখাবেন কি করে? যদিও তাতে বক্তৃতা শোনার জন্য ছাত্র আসার কমতি ছিল না । দর্শনের অন্যান্য শিক্ষকদের কাছে এ কারণে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পান নি।
তাঁর বন্ধু ক্যারোফন একদিন ডেলফির ওরাকল এর কাছে গেলেন। ওরাকল ছিলেন একজন জ্ঞানী মহিলা এবং ভবিষ্যৎ বক্তা। আগতদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি । তাঁর উত্তরগুলো অনেকটা গোলকধাঁধার মতো শোনাত। ক্যারোফন জিজ্ঞেস করলেন, সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কেউ আছে কি? “না”, সরাসরি উত্তর দিলেন ওরাকল। আরও বললেন, “কেউই সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী নয়।” ক‍্যারোফন যখন সক্রেটিসকে এ কথা বললেন, প্রথমে সক্রেটিস তা বিশ্বাস করলেন না। তিনি আশ্চর্য হলেন এই ভেবে যে, এত কম জেনে আমি কিভাবে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী হলাম?
প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন সক্রেটিস। খালি পা, গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনোদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোনো দোকানে, মন্দিরের চাতালে কিংবা বন্ধুর বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, নিজে এমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না। লোকের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন।  আসলে প্রশ্ন করা, তর্ক করা ছিল সে যুগের এক শ্রেণীর লোকদের ব্যবসা। এদের বলা হতো সোফিস্ট। এরা পয়সা নিয়ে বড় বড় কথা বলত। সক্রেটিস তাদের সরাসরি জিজ্ঞেস করতেন, বীরত্ব বলতে তারা কি বোঝে? পাণ্ডিত্যের স্বরূপ কি? তারা যখন কোনো কিছু উত্তর দিত তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। মিথ্যা অহমিকায় কতখানি ভরপুর হয়ে আছে তারা। নিজেদের স্বরূপ এভাবে উদঘাটিত হয়ে পড়ায় সক্রেটিসের ওপর তারা সকলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সক্রেটিস তাতে সামান্যতম বিচলিত হতেন না। নিজের আদর্শ সত্যের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা।
অর্থ সম্পদের প্রতি চরম উদাসীনতা। একবার তার বন্ধু অ্যালসিবিয়াদেশ তাকে বাসস্থান তৈরি করার জন্য বিরাট একখণ্ড জমি দিতে চাইলেন। সক্রেটিস বন্ধুর দান ফিরিয়ে দিয়ে সকৌতুকে বললেন, আমার প্রয়োজন একটি জুতার আর তুমি দিচ্ছ একটি বিরাট চামড়া। এ নিয়ে আমি কি করব?
সক্রেটিসের স্ত্রী ও কলহপ্রিয়তা:
পার্থিব সম্পদের প্রতি নিঃস্পৃহতা তার দার্শনিক জীবনে যতখানি শান্তি নিয়ে এসেছিল তার সাংসারিক জীবনে ততখানি অশান্তি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার প্রতিও তিনি ছিলেন সমান নিঃস্পৃহ। সক্রেটিসের স্ত্রীর নাম জানথিপি (Xanthiphe)যার বয়স ছিল সক্রেটিসের থেকে অনেক কম। তার স্ত্রী জানথিপি ( Xanthiphe) ছিলেন ভয়ংকর রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে সক্রেটিসের উদাসীনতা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। একদিন সক্রেটস গভীর একাগ্রতার সাথে একখানি বই পড়ছিলেন। প্রচণ্ড বিরক্তিতে জানথিপি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রক্ষা করতে না পেরে বাইরে গিয়ে আবার বইটি পড়তে আরম্ভ করলেন। জানথিপি আর সহ্য করতে না পেরে এক বালতি পানি এনে তার মাথায় ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম যখন এত মেঘগর্জন হচ্ছে তখন শেষ পর্যন্ত একপশলা বৃষ্টি হবেই।  জানথিপি ছাড়াও সক্রেটিসের আরও একজন স্ত্রী ছিলেন, তার নাম মায়ার্ত (Myrto)।  দুই স্ত্রীর গর্ভে তার তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল যাদের নাম ছিল লামপ্রোক্লিস, সফ্রোনিস্কাস এবং মেনেজেনাস। দারিদ্র্যের মধ্যে হলেও তিনি তাদের ভরণ পোষণ শিক্ষার ব্যাপারে কোনো উদাসীনতা দেখাননি।
কোন কোন গল্পে দেখা যায় সক্রেটিসকে তার স্ত্রী ঝাড়ু-পেটা করছেন আর সক্রেটিস শান্তভাবে বই পড়ে যাচ্ছেন। যেন আশপাশে কিছুই হচ্ছে না।
সক্রেটিসের মৃত্যু:
সক্রেটিসের আদর্শকে দেশের বেশ কিছু মানুষ সুনজরে দেখেনি। তারা সক্রেটিসের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা করল। তাছাড়া যারা ঐশ্বর্য, বীরত্ব শিক্ষার অহংকারে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করত, সক্রেটিসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের এই অহংকারের খোলসটা খসে পড়ত। এভাবে নিজেদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়ে পড়ায় অভিজাত শ্রেণীর মানুষরা সক্রেটিসের ঘোর শত্রু হয়ে উঠল। তাদের চক্রান্তে দেশের নাগরিক আদালতে ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলো মেলেতুল, লাইকন, আনাতুস নামে এথেন্সের তিনজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক।
তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনি এথেন্সের প্রচলিত দেবতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নতুন দেবতার প্রবর্তন করতে চাইছেন। দ্বিতীয়ত তিনি দেশের যুব সমাজকে ভ্রান্ত পথে চালিত করেছেন। এই অভিযোগের বিচার করার জন্য আলোচোনের সভাপতিত্বে ৫০১ জনের বিচারকমণ্ডলী গঠিত হলো। এই বিচারকমণ্ডলীর সামনে সক্রেটিস এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন।  তার সেই বক্তৃতাটি ছিল এরকম—
“হে এথেন্সের অধিবাসীগণ, আমার অভিযোগকারীদের বক্তৃতা শুনে আপনাদের কেমন লেগেছে জানি না, তবে আমি তাদের বক্তৃতার চমকে আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম, যদিও তাদের বক্তৃতায় সত্য ভাষণের চিহ্নমাত্র নেই। এর উত্তরে আমার বক্তব্য পেশ করছি। আমি অভিযোগকারীদের মতো মার্জিত ভাষার ব্যবহার জানি না। আমাকে শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থে সত্য প্রকাশ করতে দেয়া হোক।
কেন আমি আমার দেশবাসীর বিরাগভাজন হলাম? অনেক দিন আগে ডেলফির মন্দিরে দৈববাণী শুনলাম তখনই আমার মনে হলো এর অর্থ কি? আমি তো জ্ঞানী নই তবে দেবী কেন আমাকে দেবীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল এই দেখ আমার চেয়ে জ্ঞানী মানুষ।
আমি জ্ঞানী মানুষ খুঁজতে আরম্ভ করলাম। ঠিক একই জিনিস লক্ষ করলাম। সেখান থেকে গেলাম কবিদের কাছে। তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম তারা প্রকৃতই অজ্ঞ। তারা ঈশ্বরদত্ত শক্তি ও প্রেরণা থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করেন, জ্ঞান থেকে নয়।
শেষ পর্যন্ত গেলাম শিল্পী, কারিগরদের কাছে। তারা এমন অনেক বিষয় জানেন যা আমি জানি না। কিন্তু তারাও কবিদের মতো সব ব্যাপারেই নিজেদের চরম জ্ঞানী বলে মনে করত আর এই ভ্রান্তিই তাদের প্রকৃত জ্ঞানকে ঢেকে রেখেছিল।
এই অনুসন্ধানের জন্য আমার অনেক শত্রু সৃষ্টি হলো। লোকে আমার নামে অপবাদ দিল, আমিই নাকি একমাত্র জ্ঞানী কিন্তু ততদিনে আমি দৈববাণীর অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছি। মানুষের জ্ঞান কত অকিঞ্চিৎকর। দেবতা আমার নামটা দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যবহার করে বলতে চেয়েছিলেন তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী যে সক্রেটিসের মতো জানে, যে সত্য সত্যই জানে তার জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই।
আমি নিশ্চিত যে আমি অনেকের অপ্রিয়তা এবং শত্রুতা অর্জন করেছি এবং আমার চরম দণ্ড হলে এই শত্রুতার জন্যই হবে। মেলেতুস বা আনিতুসের জন্য নয়। দণ্ড হলে তা হবে জনতার ঈর্ষা ও সন্দেহের জন্য যা আমার আগে অনেক সৎকারের নিধনের কারণ হয়েছে এবং সম্ভবত আরও অনেকের নিধনের কারণ হবে। আমিই যে তাদের শেষ বলি তা মনে করার কোনো কারণ নেই। অতএব হে এথেন্সের নাগরিকগণ, আমি বলি তোমরা হয় আনিতুসের কথা শোন অথবা অগ্রাহ্য কর। হয় আমাকে মুক্তি দাও নয়তো দিও না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পার আমি আমার জীবনের ধারা বদলাব না।
আমাকে ঈশ্বর এই রাষ্ট্র আক্রমণ করতে পাঠিয়েছেন। রাষ্ট্র হলো একটি মহৎ সুন্দর ঘোড়া। তার বৃহৎ আয়তনের জন্য সে শ্লথগতি এবং তার গতি দ্রুততর করতে, তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য মৌমাছির প্রয়োজন ছিল। আমি মনে করি যে আমি ঈশ্বর প্রেরিত সেই মৌমাছি। আমি সর্বক্ষণ তোমাদের দেহে হুল ফুটিয়ে তোমাদের মধ্যে সুস্থ ভাবনা জাগিয়ে তুলি, যুক্তির দ্বারা উদ্বুদ্ধ করি এবং প্রত্যেককে তিরস্কারের দ্বারা তৎপর করে রাখি।
বন্ধুগণ সম্ভব অসম্ভবের কথা বাদ দিয়ে বলছি মুক্তিলাভের জন্য বা দণ্ড এড়ানোর জন্য বিচারকদের অনুনয় করা অসঙ্গত। যুক্তি পেশ করে তাদের মনে প্রত্যয় জন্মানোই আমাদের কর্তব্য, বিচারকের কর্তব্য হচ্ছে ন্যায়বিচার করা। বিচারের নামে বন্ধু তোষণ করা নয়।
আমি দেবতাকে বিশ্বাস করি, আমার অভিযোগকারীরা যতখানি বিশ্বাস করে তার চেয়েও অনেক বেশি বিশ্বাস করি। এতক্ষণ আমি ঈশ্বর এবং তোমাদের সামনে আমার বক্তব্য রাখলাম। এবার তোমাদের এবং আমার পক্ষে যা সর্বোত্তম সেই বিচার হোক”।
কিন্তু বিচারকদের রায়ে সক্রেটিসের ২৮১/২২০ ভোটে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যদন্ডের রায় ঘোষিত হল। তাকে হেমলক নামক বিষ স্বেচ্ছায় পান করে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সক্রেটিস হাসিমুখে রায় মেনে নিলেন। সক্রেটেসের কারারক্ষী এবং সক্রেটিসের শিষ্যরা সক্রেটিসকে পালিয়ে যেতে বললে তিনি তাতে অসম্মতি জানিয়ে বললেন যে পালিয়ে গেলে দেশের আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা করা হবে এবং সবাই ভাববে যে আমি সত্যি সত্যিই অপরাধী। বিচারের কার্যকরের দিন হাসিমুখে জল্লাদের কাছ থেকে হেমলকের পেয়ালা নিয়ে তা পান করলেন এবং কয়েক মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
সক্রেটিসের কিছু বিখ্যাত উক্তি:
  • পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি-ই ভাল আছে, জ্ঞান। আর একটি-ই খারাপ আছে, অজ্ঞতা।
  • আমি কাউকে কিছু শিক্ষা দিতে পারব না, আমি শুধু তাদের চিন্তা করাতে পারব।
  • বিস্ময় হল জ্ঞানের শুরু।
  • টাকার বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চেয়ে অশিক্ষিত থাকা ভাল।
  • জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।
  • বন্ধু হচ্ছে দুটি হৃদয়ের একটি অভিন্ন মন।
  • অপরীক্ষিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা গ্লানিকর।
  • পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান।
  • নিজেকে জান।
  • প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যে, অন্য কিছু জানার মধ্যে নয়।
  • তুমি কিছুই  জান না এটা জানা-ই জ্ঞানের আসল মানে।
  • যাই হোক বিয়ে কর। তোমার স্ত্রী ভাল হলে তুমি হবে সুখী, আর খারাপ হলে হবে দার্শনিক।
  • ব্যস্ত জীবনের অনুর্বরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।
  • আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত সাধারণের ভালর জন্য। শুধু ঈশ্বরই জানেন কিসে আমাদের ভাল।
  • সত্যিকারের জ্ঞান আমাদের সবার কাছেই আসে, যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তার সম্পর্কে কত কম জানি।
  • তারা জানে না যে তারা জানে না, আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।
  • নারী জগতে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙ্গনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস। সে দাফালি বৃক্ষের ন্যায় যাহা বাহ্যত খুব সুন্দর দেখায়। কিন্তু চড়ুই পাখি ইহা ভক্ষণ করিলে ইহাদের মৃত্যু অনিবার্য।
  • সেই সাহসী যে পালিয়ে না গিয়ে তার দায়িত্বে থাকে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
  • নিজেকে উন্নয়নের জন্য অন্য মানুষের লেখালেখিতে কাজে লাগাও এই জন্য যে অন্য মানুষ কিসের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে তা তুমি যাতে সহজেই বুঝতে পার।
  • সুখ্যাতি অর্জনের উপায় হল তুমি কি হিসেবে আবির্ভূত হতে চাও তার উপক্রম হওয়া।
  • তুমি যা হতে চাও তা-ই হও।
  • কঠিন যুদ্ধেও সবার প্রতি দয়ালু হও।
  • শক্ত মন আলোচনা করে ধারনা নিয়ে, গড়পড়তা মন আলোচনা করে ঘটনা নিয়ে, দুর্বল মন মানুষ নিয়ে আলোচনা করে।
  • বন্ধুত্ব কর ধীরে ধীরে, কিন্তু যখন বন্ধুত্ব হবে এটা দৃঢ় কর এবং স্থায়ী কর।
  • মৃত্যুই হল মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় আশীর্বাদ।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি


পরিচয়:
কোন বিখ্যাত ব্যক্তির পরিচয় তুলে ধরার জন্য তার পদবী বা তার উপাধী উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ভিঞ্চির পরিচয় উল্লেখ করার সময় পড়তে হয় সমস্যায়। কারণ তিনি একাধারে অনেকগুলো প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে যন্ত্রবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, ভাস্কর, স্থপতি ও শরীরবিদ্যাবিদ। এসব প্রতিভার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন সমান দক্ষতা। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির পুরো নাম লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি (Leonardo di ser Piero da Vinci)। ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লোরেন্সের অদূরবতী ভিঞ্চী নগরের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন বিত্তশালী একজন আইনজ্ঞ। আর মা ছিলেন কৃষক কন্যা।  ভিঞ্চি ছিলেন পিয়েরে দ্যা ভিঞ্চি এবং গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার অবৈধ সন্তান। ধারণা করা হয় তার মা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা একজন দাসী। লিওনার্দোর নামের দ্যা ভিঞ্চি নামের অর্থ হলো তিনি ভিঞ্চি নগর থেকে এসেছেন এবং লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি এর অর্থ হলো পিয়েরোর পুত্র লিওনার্দো এবং তার জন্ম ভিঞ্চিতে।
প্রথমিক জীবন:
লিওনার্দোর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে জানা গেছে খুবই অল্প। জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানোর একটি ছোট্ট গ্রামে। এরপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকোতে। সেখানে তিনি তান বাবা, দাদা-দাদী ও চাচার সাথে থাকেন। এসময় তার বাবা অ্যালবিরা নামের ১৬ বছর বয়সী এক তরুণীকে বিয়ে করেন। অ্যালবিরা লিওনার্দোকে অনেক ভালবাসত। কিন্তু অল্প বয়সেই তার মৃত্যু হয়। কৈশর জীবন সম্পর্কে লিওনার্দোর লেখা দুটি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম টি হল—একবার একটি ঘুড়ি হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে তার দোলনার উপর দিয়ে যাবার সময় তার মুখে এর লেজের পালক বুলিয়ে যায়। লোকজন এই ঘটনাকে তার ভবিষ্যত জীবনের সফলতার লক্ষণ হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনা হল—তিনি ছোটবেলায় একবার এক পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটা গুহা আবিষ্কার করেছিলেন। গুহাটা ছিল অন্ধকার আর ভুতুড়ে। তার মনে হচ্ছিল গুহার ভিতরে নিশ্চয় কোন অতিকায় দৈত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু তার অদম্য কৌতূহলের কারনে এই গুহায় কি আছে তা খুঁজে দেখেছিলেন। আদালতের নথি থেকে দেখা যায় ভিঞ্চির বয়স যখন ২৪ তখন আরও ৩ জন পুরুষ সঙ্গীসহ তাঁকে সমকামিতার (sodomy) দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে পরে অব্যহতি দেওয়া হয়। তবে দ্যা ভিঞ্চির জার্নাল থেকে দেখা যায় এ ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় তিনি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপার গোপন রাখতে পছন্দ করতেন। আর তার ওপর এ অপরাধ প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারতো। এ অভিযোগ উঠিয়ে নেবার পর তিনি ফ্লোরেন্স থেকে মিলানে চলে আসেন।
১৩ শতকের শেষ থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত ছিল ইটালিয়ান রেনেসার যুগ। এসময়ে সমগ্র ইউরোপ বিশেষ করে ইটালি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখার উন্নতির চরম শিখরে। ভিঞ্চি ছিলেন সেই সময়ের একজন মেধাবী মানুষ।
শিক্ষা-দীক্ষা:
ভিঞ্চি কোন রকম আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া গ্রহণ করেননি। তার লেখাপড়ার সবকিছুই ঘরোয়াভাবে। তার ছিল প্রকৃতির প্রতি ভীষণ টান। এজন্য তিনি বেশিরভা্গ সময় বাইরে বাইরে কাটাতে পছন্দ করতেন। ১৪৬৬ সালে লিওনার্দোর বয়স যখন ১৪ তখন তাকে ডেল ভেরোচ্চির (Verrocchio) কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে পাঠানো হয়্ এরপর দ্রুতই তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। বলা হয়ে থাকে ভিঞ্চির “দা ব্যাপ্টিজম অফ ক্রাইস্ট” এতটাই সুনিপুণ হয় যে তা দেখার পর ভেরোচ্চি জীবনের জন্য আঁকা ছেড়ে দেবার পণ করেন।
পেশাগত জীবন:
সমকামীতার অভযোগে গ্রেফতার হয়ে বেকসুর খালাস লাভের পর ভিঞ্চি ফ্লোরেন্স থেকে মিলানে চলে আসেন। এরপর ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি কি করেছেন, কোথায় ছিলেন তার কিছুই জানা যায় না। ধারণা করা হয় এই সময়ে তিনি ১৪৭৮ থেকে ১৪৮১ পর্যন্ত তার নিজের ওয়ার্কশপে কাজ করেছেন। এরপর ১৪৭৮ সালে চ্যাপেল অব সেন্ট বার্নার্ড ও অ্যাডোরেশন অব দি ম্যাগি এবং ১৪৮১ সালে মঙ্ক অব সান ডোনাটো এ স্কাপিটো (Monks of San Donato a Scopeto) এর জন্য “দ্যা এ্যডোরেশন অভ দ্যা ম্যাগী” আঁকার কাজ পান।
ভাসারির মতে লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন। এর নাম ছিল লরেঞ্জো দ্যা মেডসি (Lorenzo de’ Medici) যা তিনি মিলানের ডিউক লুদোভিকো এল মোরো এর কাছে শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার জন্য।
লিওনার্দো ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মিলানে কাজ করেছেন। এখানে তিনি Confraternity of the Immaculate Conception এর জন্য “ভার্জিন অব দ্যা রকস” এবং “Santa Maria delle Grazie” আশ্রমের জন্য “দ্যা লাস্ট সাপার”  ছবি দুটি আঁকার দায়িত্ব পান। ১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তার অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটরিনা নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ সালে এ মহিলাটি মারা যান। সে সময় তার শেষকৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা।
প্রকৌশল এবং উদ্ভাবন
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার জীবদ্দশায় প্রকৌশলী হিসেবে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লুভোডিকো মুরো নামক এক ব্যক্তিকে তিনি এক চিঠি দিয়ে দাবি করেছিলেন যে তিনি একটি শহরের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য সয়ংক্রিয় কিছু যন্ত্র আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন। যখন তিনি ভেনিসে স্থানান্তরিত হলেন তখন সেখানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরি পান। সেখানে তিনি শহরকে বহিরাগত আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য একটি স্থানান্তরযোগ্য ব্যারিকেড তৈরিতে সক্ষম হন। লিওনার্দো তাঁর ডায়েরিতে বিভিন্ন বাস্তব এবং অবাস্তব যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, একটি যান্ত্রিক সৈন্য, হাইড্রোলিক পাম্প, ডানার মর্টার শেল এবং একটি বাষ্প কামান।
তিনি তাঁর জীবনের একটি বড় সময় উড়তে সক্ষম যন্ত্র তৈরিতে ব্যায় করেন। তাঁরই প্রদত্ত ডিজাইনে বর্তমানে আধুনিক বিমান এবং হেলিকপ্টার নির্মান করা সম্ভব হয়েছে।
১৫ শতকের শেষ দিকের বিখ্যাত ব্যক্তি Ludovico Sforza ছিলেন জ্ঞানচর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তিনি মিলানে একটি দূর্গ দখল করেন। সেখানে তিনি শহরের বিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, স্থাপতি, বৈজ্ঞানিক, চিত্রশিল্পী, দার্শনিকদের তার দূর্গে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার আমন্ত্রণে লিওনার্দো ১৪৮২ সালে তার দূর্গে আসেন। এখানে তিনি একটানা ১৭ বছর কাজ করেন। এই সময়ে তিনি বিখ্যাত গণিতবিদ Luca Pacioli এর সাথে বিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে গবেষণা করেন।
বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা ও দ্যা লাস্ট সাপার:
বাঁকা চোখের চাহনি ,চাপা হাসি আসি আর রহস্যে ভরা মুখশ্রী যে নারী সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুয়েছে তার নাম অপরূপা মোনালিসা। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এই ধরাধাম ছেড়ে যাওয়ার ঠিক এক যুগ আগেই আপন হাতের তুলি সুনিপুন টানে ক্যানভাসে আঁকেন মোনালিসা। দীর্ঘ চার বছরের সাধনা আর অধ্যবসায়ের ফসল হল এই চিত্র কর্মটি ।লিওনার্দো কাজটা শুরু করেছিলেন ১৫০৩ সালে আর ইতি টানেন ১৫০৭ এ এসে। অনেকে তো বলেন প্রায় কথায় কথায় যে মোনালিসার হাসি নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা হয়েছে তা দিয়ে একটা মহাকাব্য লিখা যাবে অতি সহজেই। শুধু হাসিতে নয় নামের ব্যাপারটাতেও অনেকের ধাঁধা লেগে যায়।কেউ বলে লাজাকান্দো আবার কেউ বলে মোনালিসা। তবে আর যাই হোক মোনালিসা নামেই তার পরিচিতি টা একটু বেশী। "মোনালিসা" তৈরির সময় সাদা ক্যানভাসের উপরে বিভিন্ন স্তর তৈরির জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করেন লিওনার্দো। আর এতে তিনি এতটাই দক্ষ আর সফল ছিলেন যে পরবর্তিতে আর কেউই এই পদ্ধতিতে সমানভাবে সফল হয়নি। বিভিন্ন অনুপাতের মিশ্রনের তৈলাক্ত স্তর ব্যবহার করে কাজটি করেন লিওনার্দো। এতে বিভিন্ন স্তরে আলাদা আলাদা ভাবে রং মিশিয়ে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন "মোনালিসা" এর । শুধু মোনালিসাই নয় আরও বেশ কয়েকটি চিত্রকর্মে লিওনার্দো এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে গেছেন। শিল্পজগতে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির এই কাজগুলো আজও সমান ভাবে রহস্যময় এবং শ্রেষ্ঠ।





‘দ্যা লাস্ট সাপার’ দেয়ালচিত্রটি ৪৫০×৮৭০ সেন্টিমিটার আকারের। এটি শোভা পাচ্ছে ইতালির মিলানের সান্তা মারিয়া দেল গ্রেজির ডায়নিং হলের পিছনের দেয়ালে। ছবিটির প্রাথমিক বিষয়বস্তু হলেন যিশুখ্রিষ্ট ও তাঁর বারোজন শিষ্য একত্রে নৈশভোজ সারছেন। খ্রিষ্টীয় ধারণানুযায়ী যিশুখ্রিষ্ট তাঁর বারোজন শিষ্যকে নিয়ে মৃত্যুর আগে যে শেষ নৈশভোজ সারেন তাই যিশুর শেষ নৈশভোজ নামে পরিচিত। এই ভোজে যিশু তাঁর বারোজন শিষ্যকে নিয়ে মদ পান করেন ও রুটি খান। নৈশভোজে যিশু ঘোষণা করেন এই শিষ্যদেরই একজন পরদিন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। আলোচ্য চিত্রে ফুটে ওঠেছে যিশু তার শিষ্যদেরকে এই কথাটি বলছেন আর তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে কে সে বিশ্বাসঘাতক।
ছবিতে যিশুর বারোজন শিষ্যকে তিনজনের একেকটা দলে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে আর যিশুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন যিশু সম্পূর্ণ মাঝখানে আলাদাভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন। এই চিত্রটি তেরোজন পুরুষের একটি চিত্রকর্ম। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এ ছবিতে যিশুর মুখ ফুটিয়ে তোলার জন্য দীর্ঘ সময় নিয়েছিলেন বলে শোনা যায় যাতে যিশুর মুখে অভিব্যক্তিহীন একটা আবহ ফুটিয়ে তোলা যায়।

সেপ্টেম্বর ১৫১৩ থেকে ১৫১৬ পর্যন্ত অধিকাংশ সময় তিনি রোমে দশম পোপ এর অধীনে কাটিয়েছিলেন। অক্টোবর ১৫, ১৫১৫ তে যখন রাজা ফ্রান্সিস-১ম মিলান দখল করলেন তখন লিওনার্দো তার অধীনে কাজ শুরু করেন। তিনি তখন রাজার বাসভবনের পাশেই "ক্লস লুইস" নামক ভবনে বসবাস করতে শুরু করলেন যেখানে তিনি তার জীবনের পরবর্তী ৩ বছর অতিবাহিত করেন। ২রা মে ১৫১৯ এ লিওনার্দো এই "ক্লস লুইস" ভবনে মৃত্যু বরণ করেন।
লিওনার্দোর আঁকা মানুষের মুখের গোল্ডেন রেশিও।


তথ্য সুত্র : অনলাইন ঢাকা.কম

হেলেন কিলার, যে অন্ধ হয়েও অন্ধ নয়


সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন অতি যত্ন করে। অতিশয় যত্ন করে তিনি মানুষের নাক, চোখ, মুখ সহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। নাক, চোখ, মুখ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মানুষের অতি মূল্যবান এবং শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্তু আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছে যাদের কারোও হাত, কারোও পা নেই, কারও চোখ নেই। কেউবা আবার কথা বলতে পারে না, কেউ কানে শোনে না। কিন্তু এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনেক মানুষ নিজ গুণে তাদের নিজেদেরকে করেছেন মহিমান্বিত ও সম্মানিত এবং শ্রেষ্ঠ। তেমনই একজনহলেন হেলেন কিলার। যিনি জন্মেছিলেন স্বাবাভিক ভাবে। কিন্তু মাত্র ১৯ মাস বয়সেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও কথা বলার শক্তি হারান। অর্থাৎ বেঁচে থেকেও একজন মৃত মানুষ হয়ে ছিলেন। কিন্তু অদম্য সাহস আর ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছিল তার সমস্ত প্রতিকূলতা। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি হয়ে আছেন আজও অমর এবং শ্রদ্ধাভাজন। কি করেছেন তিনি? কিভাবেই বা সম্ভব হল তার সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করা?  আসুন আজ জেনে নিই হেলেন কিলার সম্পর্কে বিস্তারিত।
  
পরিচয় ও শৈশবকাল:
হেলেন কিলারের পুরো নাম হেলেন এ্যাডামস কিলার। ১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলর আলবামার তুসকাম্বিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এ মহীয়সী নারী। তার বাবার নাম আর্থার কিলার এবং মায়ের নাম ক্যাট এ্যাডামস কিলার। তিনি একাধারে একজন লেখক, রাজনৈতিক কর্মী, মানবতাবাদী। হেলেনের বয়স যখন মাত্র ১৯ মাস তখন তিনি মারাত্মকভাবে জ্বরে আক্রান্ত হন। এসময়ে অন্ধ বধীর ও বোবা হয়ে যান। ফলে তার বাবা-মা তার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন। তথাপি তারা তার চিকিৎসা বন্ধ করেননি। হেলেনের বয়স যখন ৬ বছর তখন তার বাবা-মা তাকে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে নিয়ে যান হেলেনের চিকিৎসা করার জন্য। গ্রাহামবেল তখন মাত্রই টেলিফোন আবিষ্কার করেছেন এবং ঐ সময়ে তিনি অন্ধ ও বধিরদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিলেন। বেল হেলেনকে পরীক্ষা করে জানালেন যে হেলেন আর কোনদিনই দেখতে বা শুনতে পারবে না। তবে তিনি হেলেনের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করলেন। তিনি জানালেন যে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে হেলেনের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব।

পড়াশুনা ও বেড়ে ওঠা:
পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশার মাঝেই শুরু হয় হেলেন কিলারের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। ৮ বছর বয়সে এ্যানি সুলিভান নামের এক গৃহশিক্ষিকা তার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন যিনি নিজেও একজন অন্ধ ছিলেন। এ্যানি সুলিভান সার্বক্ষণিক হেলেনের পাশে থাকতেন। হেলেনের সমস্ত কাজে এ্যানি সাহায্য করতেন। এভাবেই তাদের দুজনের সম্পর্ক স্থায়ী হয় ৪৯ বছর। এ্যানি প্রথমে আঙুল দিয়ে হেলেনের হাতে বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে এবং এরপর বর্ণমালা কার্ড দিয়ে বর্ণমালা শেখান। মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লেখা, ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়াসহ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শিখে ফেলেন। তারপর তাকে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করান। ১৮৯০ সালে ১০ বছর বয়সে নরওয়েতে উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুসরণ করে কথা বলা শেখেন হেলেন। এতে পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনরা অবাক হয়ে যান। ১৯৯৪ সালে যখন তার বয়স ১৪, হেলেন নিউইয়র্কের ‘রাইট হামসন’ স্কুলে ভর্তি হন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ১৯০০ সালে তিনি রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯০৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রী অর্জন করেন। এই ডিগ্রী অর্জনের আগেই ১৯০৩ সালে তার আত্মজীবনী ‘দ্যা স্টোরি অব মাই লাইফ’  প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তিনি অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রী।
হেলেনের যোগাযোগ করতে শেখা:
এ্যানি সুলিভান হেলেনকে অন্য মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে শিখিয়েছেন। প্রথমদিকে হেলেন এ্যানি সুলিভানের শিখিয়ে দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী হাত উঠাতে না পেরে খুবই হতাশ হয়ে যেতেন। যাই হোক এভাবে এক মাস চলার পর সুলিভানের দেওয়া হাতের ইশারা মতো পানি শব্দটি শিখে ফেলেন। সুলিভান হেলেনের বাম হাতে পানি ঢালতেন এবং ডান হাতে পানি শব্দটি লিখতেন। এই ব্যাপারটি হেলেনকে পদ্ধতিটি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। এভাবে হেলেন কিছুদিনের মধ্যেই গৃহস্থালির বেশ কয়েকটি জিনিস চিনতে পারে। এভাবে হেলেন দ্রুত উন্নতি করতে থাকে। সে দ্রুতই ব্রেইল পদ্ধতিতে দক্ষ হয়ে ওঠে এবং ফলপ্রসূ শিক্ষা লাভে সমর্থ হয়। হেলেন আশাতীত উন্নতি করতে থাকে। পরবর্তীতে সে ব্রেইল টাইপরাইটারে লিখতে শিখে। রেডক্লিফ কলেজে পড়ার সময় হেলেন কথা বলতে শেখে এবং মুখে পড়ার অনুশীলন করে। তার স্পর্শের অনুভূতি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ণ। এভাবেই হেলেন কথা বলা এবং লেখাতে দক্ষ হয়ে ওঠে।
রাজনীতি ও সমাজসেবা:
হেলেন রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করেছেন। হেলেন ছিলেন American Socialist Party-র   সমর্থক। তিনি সেখানে১৯০৯ সালে যোগদান করেন। তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা। তার বই ‘Out of The Dark-এ এই বিষয়ে আলাদা আলাদা রচনা লিখেছেন। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনিEugene V Debs এর সমর্থন পেয়েছেন।  ১৯১২ সালে তিনি Industrial Workers of the World (IWW)- যোগদান করেন। হেলেন ছিলেন একজন Pacifist এবং তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার বিরুদ্ধে ছিলেন।
১৯১৮ সাল থেকে হেলেন তার জীবনের অধিকাংশ সময় অন্ধদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ অতিবাহিত করেছেন। এসময় তিনি নিজের প্রতিবন্ধকতার কথা উপলব্ধি করে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দের জন্য গড়ে তোলেন নতুন নতুন সমিতি ও স্কুল। সমাজের বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে হেলন প্রচেষ্টা চালান। এতে তিনি ব্যাপক সফলতা পান। তার জীবদ্দশায় আমেরিকার সকল রাষ্ট্রপতি এবং আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, মার্ক টোয়েন, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিগণ তাকে সহায়তা পাঠান। তিনি ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সাথে নিয়ে ‘হেলেন কিলার ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলেন। সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন বিভিন্ন হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি যুদ্ধাহত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের উৎসাহিত করতেন ও সাহস যোগাতেন এবং আশার কথা শোনাতেন। যুদ্ধ শেষে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্ট-প্রতিবন্ধী দের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
বিশেষ কিছু:
  • হেলেন তার জীবনে প্রায় ১১ টি বই রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দি স্টোরি অব মাই লাইফ, দি ওয়াল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর, আউট অব দি ডার্ক ইত্যাদি।
  • অনেক দৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞানী মানুষের চেয়েও হেলেন বেশি বই পড়েছেন।
  • তিনি বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি চলচিত্র রচনা করেছেন যেখানে তিনি নিজেই নিজ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
  • বাদ্যযন্ত্রের উপর হাত রেখেই তাতে কি সুর বাজছে তা বলতে পারতেন। দীর্ঘদিন পরেও কারও সাথে হাত মেলালে বলে দিতে পারতেন লোকটি কে।
  • তিনি নদীতে সাতার কাটতে পারতেন। নৌকা চালাতে পারতেন। ঘরে বসে নকশী কাথা সেলাই করতে পারতেন।
  • তিনি দাবা, তাসও খেলতে পারতেন।
  • ১৯৫৯ সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।
  • হেলেনর লেখা একটি কবিতা
"They took away what should have been my eyes
  But I remember Milton's Paradise
 They took away what should have been my ears
 Beethoven came and wiped away my tears
 They took away what should have been in my tongue
 But I had talked with God when I was young
 He would not let them take away my soul
 Possessing that I still possess the whole."

ভাষান্তর:

"আমার দৃষ্টিদ্বয় তারা সরিয়ে নিল
 যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিল
 কিন্তু আমি স্মরণ করি মিল্টনের স্বর্গখনি,
 আমার শ্রবণদ্বয় তারা সরিয়ে নিল
 যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিল
 বীথোভেন এসে মুছালো আমার চোখের পানি।
 আমার জিহবা তারা সরিয়ে নিল
 যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিল
 যখন আমি ছোট ছিলাম
 ঈশ্বরের সাথে কত কথা,
 সম্পূর্ণ পোষণ করি
 তিনি তাদের অনুমতি দিবেন না
 সরিয়ে নিতে আমার আত্মা।" 
মৃত্যু:
১৯৬৮ সালের ১লা জুলাই হেলেন কিলার পরোলোকগমন করেন। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য এবং তার অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকরন এসোসিয়েশন ফর দি ওভারসীজ ব্লাইন্ড’ যার বর্তমান নাম হেলেন কিলার ইন্টারন্যাশনাল গঠন করা হয়েছে।

তথ্য সুত্র : অনলাইন ঢাকা.কম

মাইকেল মধুসূদন দত্ত একজন মহাকবির গল্প


দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে; তিষ্ঠ ক্ষণকাল। এ সমাধিস্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত্ত
দত্ত-কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসুদন।
যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমী, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
 রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী।
প্রাথমিক পরিচিতি:
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ঊনবিংশ মতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও নাট্যকার তথা বংলার সাহিত্যে নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা। তিন ঊনবিংশ শতাব্দীতে (২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪) অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলার কপোতক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সাগরদাড়ি গ্রামে এক বিখ্যাত বিত্তশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম রাজনারায়ন দত্ত ও মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। মধুসূদন ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান। মধুসূদনের বাবা রাজনারায়ন দত্ত ছিলেন কোলকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের একজন খ্যতনামা উকিল। মধুসূদন সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও যৌবনে তিনি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি তার ছিল দূর্নিবার আকর্ষণ। যার ফলে সাহিত্যিক জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য রচনায় আগ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং ইংরেজীতে সাহত্য রচনা শুরু করেন। পরবর্তিতে তিনি জীবনের ঘটনাচক্রে আবার বাংলায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার প্রবর্তক। তিনি বাংলায় প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেছেন ও বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক।
শৈশব এবং শিক্ষা: মধুসূদনের শিক্ষা আরম্ভ হয় তার মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে। সাগরদাড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। বিদ্বান ইমামের কাছে তিনি বাংলা, ফারসী ও আরবি পড়েছেন। সাগরদাঁড়িতেই মধুসূদনের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। পরে সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং খিদিরপুর স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে দু’বছর পড়ার পর ১৮৩৭ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়েই মধুসূদন কাব্যচর্চা শুরু করেন। তখন তাঁর কবিতা জ্ঞানান্বেষণ, Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি কাড়েন।
১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী কবি মধুসূদন খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। এই সময় তিনি হিন্দু কলেজ পরিত্যাগ করে শিবপুরস্থ বিশপস কলেজে ভর্তি হন এবং চার বছর সেখানে অধ্যয়ন করেন। এখানে অধ্যয়নকালে তিনি গ্রীক, ল্যাটিন, ফরাসী, হিব্রু প্রভৃতি ভাষা আয়ত্ব করেন।
মধুসূদনের কর্ম-জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ:
বিশপস কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাবার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে। কিন্তু তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করেন। তাই তিনি ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি  খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তখন থেকেই তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়। তাঁর এই ধর্মান্তর সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁর বিধর্মী পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে মধুসূদন ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন। কিন্তু শিক্ষকতা করে প্রাপ্ত অর্থে নিজের খরচ সংকুলান করতে পারতেন না। এসময়ে মাদ্রাজে তিনি সাংবদিকতা শুরু করেন এবং পরিচিত লাভ করেন। এখানে তিনি Hindu Chronicle, Madraz Circulator and General Chronicle এবং Eastern Guardian পত্রিকার সম্পাদকের দায়ীত্ব পালন করেন। কিন্তু তাতেও তার নিদারুন অর্থ কষ্টে দিন অতিবাহিত হতে থাকে। মাদ্রাজে অবস্থানকালে পঁচিশ বছর বয়সে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি ‘Timothy Penpoem’ ছদ্মনামে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’  (The Captive Ladie) এবং পরে দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past রচনা করেন।
মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরেই মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাদের দাম্পত্যজীবন সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়েতা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিয়ে করেন। আঁরিয়েতা মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। এদিকে মাইকেল তাঁর এক কপি দ্য ক্যাপটিভ লেডি বন্ধু গৌরদাস বসাককে উপহার পাঠালে, গৌরদাস সেটিকে জে ই ডি বেথুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠান। উক্ত গ্রন্থ পাঠ করে অভিভূত বেথুন মাইকেলকে চিঠি লিখে দেশে ফিরে আসতে এবং বাংলায় কাব্য রচনা করতে পরামর্শ দেন। এর ভিতর কবির মা-বাবা দুজনেই মারা যান। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ১৮৫৬ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৫৮ সালে রামনারায়ন তর্করত্নের রত্নাবলী নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করার সময় তিনি বাংলয় নাটক লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এমন একটি পরিস্থিতিতে তিনি মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে ১৮৫৯ সালে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। মুলত এটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক নাটক এবং তিনিই প্রথম নাট্যকার।

কলকাতায় ফিরে এসে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানীর কাজ নেন। পরে দোভাষী হিসেবে কাজ করেন।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণের জন্য কবি ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করতে যান। কিন্তু বর্ণবাদের কারণে তিনি সেখানে টিকে থাকতে পারেননি। পরে তিনি চলে যান ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে। কবি সেখানেও নিদারুন অর্থকষ্টে ভোগেন। সেখানে পড়ালেখা করার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে সাহয্য করেছেন। কিন্তু পড়াশুনা শেষে কোলকাতায় ফিরে এসে কবি কখনই তার সে জ্ঞান কাজে লাগাননি।


সাহিত্য কর্ম:
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক ভাবধারার প্রবর্তক। তিনি বহু নাটক, কাব্য ও প্রহসন রচনা করেছেন। কবি তার জীবনে ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের সাহিত্য কর্ম দ্বারা অনুপ্রাণীত হয়েছিলেন। বহু বছর পরিশ্রমের ফলে হোমেরিক স্টাইলের প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি তার মহাকাব্য মেঘনদ বধ কাব্য প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এক সময় নিজেকে বলেছিলেন:"আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাইনি, এই কাব্যের সফলতা বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।"
নাট্যকার হিসেবে মধুসূদন দত্তের সাহিত্য অঙ্গনে পদার্পণ হয়েছে। ১৮৫৯ সালে তিনি রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। ১৮৬০ সালে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ এবং রচনা করেন একটি পূর্নাঙ্গ নাটক পদ্মাবতী। পদ্মাবতীতে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন। এরপর তিলোত্তমাসম্ভব, মেঘনাদ বধ কাব্য মহাকাব্য ব্রজঙ্গনা কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, বীরঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতা বঙ্গভূমি প্রভৃতি লেখেন। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ প্রহসনে তিনি ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’-তে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এছাড়া্ও কবি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। তার লেখা চতুর্দশপদী কবিতার হাত ধরেই বংলায় সনেটের যাত্রা শুরু।

বঙ্গভূমি
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;--
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!
অনিদ্রায়, অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;--
কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে, --
"ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যারে ফিরি ঘরে।"
পালিলাম আজ্ঞা সুখে' পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে‍‍‍‍‍‍‍‍‍‌‌‌।।
উপরোক্ত কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা সনেট। এই কবিতার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যে সনেটের যাত্রা শুরু হয়।

সাহিত্যের বৈশিষ্ট:
রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক, বীর যোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।

মধুসূদনের কাব্যে এক ধরনের নারীবিদ্রোহের সুর লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যের নায়িকাদের মধ্য দিয়ে যেন যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, আত্ম সুখ-দুঃখ প্রকাশে অনভ্যস্ত ও ভীত ভারতীয় নারীরা হঠাৎ আত্মসচেতন হয়ে জেগে ওঠে। তারা পুরুষের নিকট নিজেদের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং কামনা-বাসনা প্রকাশে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তাঁর বীরাঙ্গনা (১৮৬২) পত্রকাব্যের নায়িকাদের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে।

মধুসূদনের এ সময়কার অপর দুটি রচনা হলো কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) ও ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)। প্রথমটি রাজপুত উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত একটি বিয়োগান্তক নাটক এবং দ্বিতীয়টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য।

ভার্সাইতে অবস্থানকালে তাঁর জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এখানে বসেই তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এটিও এক বিস্ময়কর নতুন সৃষ্টি।

মধুসূদন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। তিনি তাঁর কাব্যের বিষয় সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে। কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী সমকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে তিনি তা কাব্যে রূপায়িত করেন এবং তার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়।

শেষ জীবন:
বাংলার এই মহান কবির শেষজীবন অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেষজীবনে তিনি উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরি ঘরে বসবাস করতেন। স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহা কবি কপর্দকহীন অবস্থায় জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্য সুত্র : অনলাইন ঢাকা.কম

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস


প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয়ভাবে অবদানের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রথম স্থানেই ধরে রেখেছে। দেশের বহু জ্ঞানীগুণী, পণ্ডিত, শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ ছাড়া এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রিয় পাঠক, আপনাকে আমরা আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিচিতি করার চেষ্টা করব।

অবস্থান:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের তথা পূর্ব বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।  ১৯২১ সালের ১লা জুলাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্য়ক্রম শুরু হয়। বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে পূর্ব বঙ্গে মুলিম সমাজে যে নবজাগরণ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তারই ফল। রাজধানী ঢাকার একেবারে কেন্দ্রস্থলে আবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি। এর পশ্চিমে ইডেন কলেজ, পূর্বে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, এর উত্তর দিকে নিউ এলিফ্যান্ট রোড এবং দক্ষিণে  রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।   

বর্ণনা:
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড  খ্যাত দেশের সর্বপ্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রধান বিদ্যাপিঠ। এটি ঢাকা শহরের  প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।  ১৯২১ সালে মাত্র ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এর যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠাকালে শিক্ষার্থীদের জন্য ৩টি আবাসিক হল ছিল। বর্তমানে ১৩টি অনুষদ (ভর্তি কার্যক্রম চলে ১০টি অনুষদের মাধ্যমে), ৭৭টি বিভাগ, ১১টি ইনস্টিটিউট, ৩টি হোস্টেল সহ ৫১টি গবেষণা সেন্টার রয়েছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ২০ টি আবাসিক হল আর ৩ টি হোস্টেল। ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৩৭,০৬৪ জন ও শিক্ষকের সংখ্যা  প্রায় ১৮০৫ জনে উত্তীর্ণ হয়েছে।
দেশের ক্রান্তিকালে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল তৎপর। এখনও এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। গত ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি উদযাপন করে প্রতিষ্ঠার ৯৪ বছর।

কর্মকতা ও কর্মচারীর সংখ্যা 
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকরতার প্রায় সংখ্যা ১০০০ জন, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা এক হাজার ৯৫ জন এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা দুই হাজার ৪৩৫ জন।
 
শিক্ষার্থী 
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা (২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) ৩৭ হাজার ৬৪ জন। এছাড়া পিএইচডি ডিগ্রিতে ছাত্রছাত্রী রয়েছে এক হাজার ৮৯ জন। এমফিল ডিগ্রিরত রয়েছেন এক হাজার ৬২০ জন। এ ছাড়া এযাবৎ কাল পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন এক হাজার ২৬২ ছাত্রছাত্রী এবং এমফিল শেষ করেছেন এক হাজার ২১৭ জন। প্রতি বছর এখানে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য রয়েছে ২০টি আবাসিক হল ও তিনটি হোস্টেল।
অধিভুক্ত সংগঠন ও অঙ্গসংগঠন:
এখানে রয়েছে ২৮১টি ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে, অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে ৯১টি।

ডিগ্রি সমূহ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি, এমফিল, মাস্টার্স ও অনার্স ডিগ্রি দেওয়া হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ডিপ্লোমা ডিগ্রিও দিয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস:
সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান প্রস্তাবক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্ত্বার বিকাশের লক্ষ্যে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া  শুরু হয়। ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তে পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিবাদের ফসল হচ্ছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক ইতিহাসবিদ মতে বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে  লর্ড লিটন বলেছিলেন ‘স্পেল্নডিড ইম্পিরিয়াল কমপেনসেশন’। পূর্ববঙ্গ শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর এ অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে।

১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। এর মাত্র তিন দিন পূর্বে ভাইসরয় এর সাথে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়ে ছিলেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব  সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন ব্যারিস্টার আর নাথানের নেতৃত্বে ডি আর কুলচার, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার প্রভাবশালী নাগরিক আনন্দ চন্দ্র রায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ এ টি আচির্বল্ড, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়,  ঢাকা মাদরাসার (বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) তত্ত্বাবধায়ক শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, মোহাম্মদ আলী (আলীগড়), প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ এইচ আর জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি ডব্লিউ পিক এবং সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ সতীশচন্দ্র আচার্য।

১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট এবং সে বছরই ডিসেম্বর মাসে সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাস করে ‘দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০’। নাথান কমিশন রমনা অঞ্চলে ৪৫০ একর জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। এই জায়গায় তখন ছিল ঢাকা কলেজ, গভর্নমেন্ট হাউস, সেক্রেটারিয়েট ও গভর্নমেন্ট প্রেসসমূহ।

শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। কলকাতার তৎকালীন একটি শিক্ষিত মহল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। এ ছাড়া ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশ হয়। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এ বিলে সম্মতি দেন। এ আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। এ আইনের বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি ছিলেন স্যার পি জে হার্টস। প্রথম মুসলমান, বাঙালি ও উপমহাদেশের প্রথম ভিসি স্যার এ এফ রহমান। বর্তমানে ২৭তম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়।  কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ান, গণিত এবং আইন।

প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭। শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ (ইংরেজি বিভাগ, এমএ-১৯২৩)।

যে সব প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে শিক্ষকতার সাথে জড়িত ছিলেন তারা হলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এফ সি টার্নার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জি এইচ ল্যাংলি, হরিদাস ভট্টাচার্য, ডব্লিউ এ জেনকিন্স, রমেশচন্দ্র মজুমদার, স্যার এ এফ রহমান, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও ভারত বিভক্তি আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্তির পর তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা উজ্জীবিত হয়। নতুন উদ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকা  শুরু হয়। তৎকালীন পূর্ববাংলার ৫৫টি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭-৭১ সালের মধ্যে ৫টি নতুন অনুষদ, ১৬টি নতুন বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ শহীদ হয়েছেন বহুজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদসমূহ:
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  ১৩টি অনুষদ রয়েছে। ১৩টি অনুষদ হলো------
  • ·         কলা অনুষদ,
  • ·         জীববিজ্ঞান অনুষদ,
  • ·         বাণিজ্য অনুষদ,
  • ·         পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদ,
  • ·         শিক্ষা অনুষদ,
  • ·         প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ,
  • ·         চারুকলা অনুষদ,
  • ·         আইন অনুষদ,
  • ·         চিকিৎসা বিদ্যা অনুষদ,
  • ·         পিজিএমআর অনুষদ,
  • ·         ফার্মেসি অনুষদ,
  • ·         বিজ্ঞান এবং
  • ·         সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ।


অনুষদ অনুযায়ী বিভাগসমূহ
অনুষদের নাম 
বিভাগসমূহ
  • ·         কলা অনুষদ
বাংলা, ইংরেজি, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, ইতিহাস, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সংস্কৃত ও পালি, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, ভাষা বিজ্ঞান, নাট্যকলা ও সঙ্গীত, বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব বিভাগ ।
  • ·         বিজ্ঞান অনুষদ 
পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, পরিসংখ্যান বিভাগ। 
  • ·         আইন অনুষদ 
আইন বিভাগ 
  • ·  বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ 
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং, হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ও ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ। 
  • ·         সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ 
অর্থনীতি বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, নৃবিজ্ঞান, পপুলেশন সায়েন্সেস, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, উইমেন্স স্টাডিজ ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ। 
  • ·         জীববিজ্ঞান অনুষদ 
মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অণুজীব বিজ্ঞান, মৎস্যবিজ্ঞান, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ। 
  • ·         ফার্মেসি অনুষদ 
ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি, ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগ। 
  • ·         ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদ 
ভূগোল ও পরিবেশ এবং ভূতত্ত্ব বিভাগ। 
  • ·         ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেকনোলজি অনুষদ 
ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস এবং কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। 
  • ·         চারুকলা অনুষদ 
অঙ্কন ও চিত্রায়ন, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রিন্ট মেকিং, প্রাচ্যকলা, ভাস্কর্য, কারুশিল্প, মৃৎশিল্প।
  • ·         চিকিৎসা অনুষদ 
স্নাতকোত্তর চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদ, স্নাতকোত্তর চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণা অনুষদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউটসমূহ:
  • ·         শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
  • ·         আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট
  • ·         পরিসংখ্যান গবেষণা ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
  • ·         ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট
  • ·         খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট
  • ·         সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
  • ·         স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট
  • ·         তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট
  • ·         ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র
  • ·         বায়ো মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার
  • ·         ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ
  • ·         ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ
  • ·         দেভ সেন্টার অব ফিলোসফিক্যাল রিসার্চ
  • ·         বোস সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ  ইন ন্যাচারাল সায়েন্স
  • ·         সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সায়েন্স
  • ·         সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ ইন হিউম্যানিটিজ
  • ·         উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র
  • ·         সেন্টার ফর ডিজাস্টার রিসার্চ
  • ·         ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সাইন্স
  • ·         সেন্টার ফর রিসার্চ ইন আর্কাইভ অ্যান্ড হিস্টরি
  • ·         নজরুল রিসার্চ সেন্টার
  • ·         নাজমুল করিম স্টাডিজ সেন্টার
  • ·         সেমিকন্ডাক্টার টেকনোলজি রিসার্চ সেন্টার
  • ·         সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ
  • ·         নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্র
  • ·         ডেলটা স্টাডি সেন্টার
  • ·         সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ  ইন ফিজিক্যাল, কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস
  • ·         সেন্টার ফর বায়ো-টেকনোলজি রিসার্চ
  • ·         বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ
  • ·         হিস্টরি রিসার্চ সেন্টার
  • ·         বায়োটেকনোলজি রির্সাচ সেন্টার
  • ·         ঢাকা ইউনির্ভাসিটি সাইবার সেন্টার
  • ·         সেন্টার ফর এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং
  • ·         জাপান স্টাডিজ সেন্টার
  • ·         সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন আর্টস এন্ড সোস্যাল সায়েন্স (সিএআরএএসএস)
  • ·         সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল স্টাডিজ
  • ·         বাংলাদেশ কালচারাল রিসার্চ সেন্টার
  • ·         ড. সিরাজুল হক ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার
  • ·         সেন্টার ফর করর্পোরেট গর্ভরনেস অ্যান্ড ফাইনেন্স স্টাডিজ

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ:
টিএসসি চত্ত্বর
ছাত্র-শিক্ষক মিলন কেন্দ্র খ্যাত এই স্থাপনার স্থপতি কনস্টানটাইন ডক্সাইড। এই স্থানটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক ছাড়াও নগরের অনেক মানুষের মিলন কেন্দ্র। সাস্কৃতিক চর্চার এই স্থানটি বহু সামাজিক ও সাস্কৃতিক সংগঠনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
মধুর ক্যান্টিন
মধুসূদন দে-এর স্মৃতি স্মরণে স্থাপিত একটি বিখ্যাত রোস্তোরা যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট ভবনের সামনে অবস্থিত। এটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে অধিক পরিচিত। ‘মধু দা’ ও ‘মধুর কেন্টিন’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম।

ডাকসু ভবন
বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ছাত্রদের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ ডাকসুকে কেন্দ্র করেই। তবে সম্প্রতি এই ঐতিহ্যবাহী ডাকসু ভবনকে ভেঙে ১২ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে প্রাথমিকভাবে ৩ তলাবিশিষ্ট ভবন তৈরি করা হচ্ছে। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আদলে তৈরি করা হচ্ছে বহুতল নতুন ডাকসু ভবন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের স্মরণীয় করে রাখতে একটি স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নতুন ডাকসু ভবনের প্রথম তলা ফাঁকা থাকবে। দ্বিতীয় তলায় থাকবে ক্যাফেটেরিয়া, তৃতীয় তলায় থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়াম অর্থাৎ ডাকসু সংগ্রহশালা। এছাড়া থাকবে ডাকসুর জন্য অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম, একাধিক সেমিনার কক্ষ, লাইব্রেরি, ডাকসু নেতাদের জন্য আলাদা কক্ষ।

অপরাজেয় বাংলা
অপরাজেয় বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অবস্থিত একটি ভাস্কর্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মরণে নিবেদিত তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এর স্থাপত্য শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। ভাস্কর্যটি তৈরির কাজ ১৯৭৩ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৯ সালে শেষ হয়। ৬ ফুট বেদীর উপর নির্মিত এর উচ্চতা ১২ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট।




ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম উপচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্যার পি জে হার্টগ। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ২০০৯ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৭তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

তথ্য সুত্র : অনলাইন ঢাকা.কম

তিতুমীরের ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লার ইতিহাস


আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যারা আলেম-ওলামা, পীর মাশায়েখ ছিলেন তারাই সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের সাহসী, আপোষহীন, নির্ভীক ও সৎ নেতৃত্বের কারণেই হয়তো আজ আমরা আমাদের মুসলিম স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য নিয়ে সগর্বে পরিচয় দিতে পারছি। তারা স্বাধিকার আন্দোলন ও প্রতিরোধ সংগ্রামে অগ্রণী না হলে আজও হয়তো আমাদেরকে ইংরেজ অথবা হিন্দু রাজাদের গোলামী করতে হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশ ইংরেজ আর হিন্দু জমিদারদের গোলামীর জিঞ্জিরকো বিদ্রোহের আগুনের তাপ-দাহে ছারখার করে মুসলমান ও সাধারণ জনগণের অধিকার আদায়ে যারা নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাওলানা সাইয়িদ মীর নিসার আলী তীতুমীর।
তিতুমীরের পরিচয়:
শহীদ তীতুমীর ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী একজন বিপ্লবী। অত্যাচারী জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 
তীতুমীরের আসল নাম হচ্ছে, সৈয়দ মীর নিসার আলী । তার ডাকনাম তীতুমীর হলেও তার দাদী তাকে তিতা-মীর নামে ডাকতেন। এর পেছনে অবশ্য একটি কারণও ছিল। তীতুমীর ছেলেবেলায় খুব রোগা ছিলেন। রোগ নিরাময়ের জন্য তার দাদী গাছের বাকল, লতা-পাতা, শিকড় বেটে তিতা রস বানিয়ে তাকে খাওয়াতেন । তিনি অনায়াসে গিলে ফেলতেন সেই তিতা রস। সেই থেকে দাদী তাকে ডাকতে শুরু করেন তিতা-মীর।
তীতুমীর ছিলেন হযরত আলী (আঃ) এর বংশধর। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহাদাত আলী আরব থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আসেন । তিনি ও তাঁর বংশধররা ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তীতুমীর ছিলেন বিপরীত চিন্তাধারার লোক। তিনি ইংরেজি শাসক ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথ বেছে নেন।
তিতুমীরের বিদ্রোহ  বাঁশের কেল্লা:
১৮২২ সালে হজ পালন করেন। সে সময় তার চিন্তাধারার বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হয়। মক্কায় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হযরত শাহ মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তিতুমীরকে নিয়ে তার পীর হযরত সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর কাছে যান। ধর্ম সংস্কারক ব্রেলভী ছিলেন উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। মদিনার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে মিসর, পারস্য, আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক স্থান ও পীর-আলেমদের কবর জিয়ারত শেষে ভারতবর্ষে ফেরেন।
তিতুমীর ১৮২৭ সালে গ্রামে ফিরে শিরক ও বিদাতমুক্ত সমাজ গঠনের দাওয়াতে নেমে পড়েন। অল্প দিনেই তিন-চারশ’ শিষ্য সংগ্রহ করেন৷ দরিদ্র কৃষকদের নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তারা হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে ‘তাহ্‌বান্দ’ নামে এক ধরনের কাপড় পরা শুরু করেন। ১৮২৮ সাল পর্যন্ত মুসলিম সমাজ গঠনের দাওয়াত শান্তিপূর্ণভাবে চলে।
তার সাফল্যে হিন্দু জমিদাররা ভয় পেয়ে যায়৷ এরপর শুরু হয় ওয়াহাবীদের ওপর জমিদারদের অত্যাচার। এমনকি দাড়ি, মসজিদ নির্মাণ, নাম পরিবর্তনের ওপর খাজনা আদায় শুরু হয়। এসব কারণে তিতুমীরের সঙ্গে স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়। স্থানীয় জমিদারদের সঙ্গে কয়েকটি সংঘর্ষে জয়লাভ করেন তারা৷ তার নির্দেশে হিন্দু-মুসলমান প্রজারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে।
এরপর বারাসাতে সরকারের বিপক্ষে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চব্বিশ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত এ বিদ্রোহে বর্ণ হিন্দুর অত্যাচারে জর্জরিত অনেক হিন্দু কৃষকও অংশগ্রহণ করে। এতে গোবর গোবিন্দপুরের জমিদার নিহত হন।
তিতুমীরকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৩০ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারকে পাঠায়। কিন্তু আলেকজান্ডার যুদ্ধে পরাস্ত হয়৷ এরপর বাঘারেয়ার নীলকুঠি প্রাঙ্গণের এক যুদ্ধে নদীয়ার কালেক্টর এবং নদীয়া ও গোবর ডাঙ্গার জমিদারের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তীতুমীর জয়ী হন। তিতুমীর নিজেকে স্বাধীন বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করেন।
ওই বছর জমিদার কৃষ্ণ দেব রায় পার্শ্ববর্তী সরফরাজ পুরে (বর্তমান সর্প রাজপুর) শত শত লোক জড় করে শুক্রবার জুমার নামাজ রত অবস্থায় মসজিদ ঘিরে ফেলে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই দিন দু’জন মৃত্যুবরণ করেন ও অসংখ্য যোদ্ধা আহত হন।
১৮৩১ সালের ১৭ অক্টোবর সরফরাজ-পুর থেকে নারকেলবাড়িয়ায় চলে আসেন তিনি। ২৩ অক্টোবর বাঁশ এবং কাদা দিয়ে দুই স্তরবিশিষ্ট বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। বাঁশের কেল্লা তৈরিতে সহযোগিতা করেছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ। এ সময় তার অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৫,০০০ জন।
২৯ অক্টোবর কৃষ্ণ দেব নারকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে বহু লোক হতাহত করে। ৩০ অক্টোবর এ বিষয়ে মামলা দায়ের করতে গেলে কোনো ফল হয় না। ৬ নভেম্বর কৃষ্ণ দেব আবার নারকেলবাড়িয়ায় আক্রমণ করে। প্রচণ্ড সংঘর্ষে হতাহত হয় প্রচুর। এরপর গোবর ডাঙ্গার আটি নীলকুঠির ম্যানেজার মি. ডেভিস ৪০০ হাবশি যোদ্ধা নিয়ে নারকেলবাড়িয়া আক্রমণ করলেন। শেষ পর্যন্ত মি. ডেভিস প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেলেন। ২-৩ দিন পর জমিদার দেবনাথ বাহিনী নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে সংঘর্ষে প্রাণ হারান। আরও কয়েকটি সংঘর্ষের পর ১৩ নভেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্নেল স্টুয়ার্ডকে সেনাপতি করে একশত ঘোড়া, তিনশত পদাতিক সৈন্য ও দুটি কামানসহ নারকেলবাড়িয়ায় পাঠান। প্রচণ্ড সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অসংখ্য লোক হতাহত হয়। দারোগা ও একজন জমাদ্দার বন্দি হন।
১৯ নভেম্বর গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরকে শায়েস্তা করতে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে সেনা বহর পাঠান। স্টুয়ার্ট বিরাট সেনা বহর ও গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন। তিতুমীরের ছিল মাত্র চার-পাঁচ হাজার সৈনিক। ছিল না পর্যাপ্ত গোলাবারুদ-বন্দুক। তবুও প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। কিন্তু তারা তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়াতে পারেননি। গোলার আঘাতে ছারখার হয়ে যায় কেল্লা। শহীদ হন বীর তিতুমীরসহ অসংখ্য মুক্তিকামী সৈনিক। ২৫০ জনেরও বেশি সৈন্যকে ইংরেজরা বন্দি করে। পরে এদের কারও কারাদণ্ড আবার কারও ফাঁসি হয়। এভাবেই বাঁশের কেল্লা আন্দোলনের মহানায়ক তীতুমীর ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ইংরেজিদের সাথে যুদ্ধের সময় শহীদ হন এবং ধ্বংস হয় তার ইতিহাস বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা। শহীদ তীতুমিরের মৃত্যুতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন আরও একশ বছর পিছিয়ে যায়। কিন্তু এতে দমে যায়নি বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বরং এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের বাসনা আরও তীব্রতর হয়। আরও শক্তিশালী আর সংগঠিত হয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে।

তথ্য সুত্র : অনলাইন ঢাকা.কম